Sunday , 10 May 2026
সংবাদ শিরোনাম
You are here: Home » নারী ও শিশু » আন্তর্জাতিক মা দিবসে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণ
আন্তর্জাতিক মা দিবসে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণ

আন্তর্জাতিক মা দিবসে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণ

মা আমার পৃথিবী ও জান্নাত
আন্তর্জাতিক মা দিবসে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মৃতিচারণ
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
আজ রবিবার। আন্তর্জাতিক মা দিবস।
পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও বিনম্র সম্মান। পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সবচেয়ে বড় বিশ্বাস, সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসার নাম—মা। জন্মের আগ থেকে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সন্তানের জীবনে যিনি নিঃস্বার্থভাবে ছায়া হয়ে থাকেন, তিনি মা।
মা এমন এক মহীয়সী নারী, যিনি সন্তানের হাসির জন্য নিজের কষ্টকে লুকিয়ে রাখেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে মায়ের ভালোবাসার মতো নিঃস্বার্থ, নির্মল ও পবিত্র ভালোবাসার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ নেই।
ইসলামে মায়ের মর্যাদা
ইসলামে মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চে স্থান পেয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের পরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মায়ের সম্মান ও অধিকারকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে।
একবার সাহাবায়ে কেরাম মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—
“ইয়া রাসুলাল্লাহ! পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ও সেবা পাওয়ার অধিকারী কে?”
তিনি উত্তরে বললেন—“তোমার মা।”
সাহাবারা আবার জিজ্ঞাসা করলেন—“তারপর কে?”
তিনি বললেন—“তোমার মা।”
তৃতীয়বারও একই প্রশ্নের উত্তরে বললেন—“তোমার মা।”
চতুর্থবার তিনি বললেন—“তোমার বাবা।”
এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে মায়ের মর্যাদা কতটা মহান।
মহানবী (সা.)-এর জীবনে মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। একবার তাঁর দুধমা হালিমা সাদিয়া তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করেন। নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে তাঁকে বসতে দেন। এটি শুধু একজন সন্তানের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাই নয়, বরং মানবজাতির জন্য এক অনন্য শিক্ষা।
মা মানেই ত্যাগ, মমতা ও অসীম ধৈর্য
একজন মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে সন্তান ধারণ করেন। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পৃথিবীতে নতুন প্রাণের জন্ম দেন। সন্তান জন্মের পর নির্ঘুম রাত, অসুস্থতা, কষ্ট, ত্যাগ—সবকিছুকে হাসিমুখে বরণ করে নেন।
একজন মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক। শিশুর ভাষা শেখা, নৈতিকতা, আদব-কায়দা, মানবিকতা—সবকিছুর সূচনা হয় মায়ের হাত ধরে। সমাজের বড় বড় মনীষী, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক কিংবা রাষ্ট্রনায়কদের সফলতার পেছনেও একজন মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি।
মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে অসাধারণ দিক হলো—তিনি সন্তানের সুখের জন্য নিজের সব কষ্ট নীরবে সহ্য করেন। ইতিহাসে দেখা যায়, পৃথিবীর অনেক মহান ব্যক্তি তাঁদের জীবনের সফলতার পেছনে মায়ের অবদানকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে স্বীকার করেছেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।” কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে লিখেছিলেন—“মা” শব্দের মতো এত মধুর শব্দ পৃথিবীতে আর নেই। একজন মায়ের দোয়া সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, যা অন্ধকার পথেও আলোর দিশা দেখায়।
পৃথিবীতে এমন অসংখ্য মা আছেন, যারা নিজেরা না খেয়ে সন্তানকে খাইয়েছেন, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন। কোনো মা সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিজের গয়না বিক্রি করেছেন, কেউ আবার সন্তানের শিক্ষার জন্য দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। একজন মা সন্তানের ব্যর্থতায় ভেঙে পড়েন না; বরং সাহস দিয়ে আবার দাঁড় করিয়ে দেন। তাই পৃথিবীর প্রতিটি সফল মানুষের গল্পের পেছনে একজন মায়ের অশ্রু, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।
সন্তানের প্রথম হাসি যেমন মায়ের পৃথিবীকে আলোকিত করে, তেমনি সন্তানের কষ্ট মায়ের হৃদয়কে রক্তাক্ত করে। মা সন্তানের ব্যথা নিজের মধ্যে ধারণ করেন। পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মল দোয়া আসে একজন মায়ের হৃদয় থেকে।
মায়ের স্মৃতি কখনো হারায় না
আমি ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিলাম। তখন আমার মা-ই ছিলেন আমার মা এবং বাবা—দুইয়ের সমান। তিনি কখনো আমাদের অভাব বুঝতে দেননি। নিজের কষ্ট গোপন রেখে সন্তানদের মানুষ করেছেন।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন আমার মা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক, আদর্শবান ও আলোকিত একজন নারী। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত এবং মানবিক মূল্যবোধ ছিল তাঁর জীবনের প্রধান আদর্শ। তাঁর শিক্ষা, উপদেশ, আদেশ ও নিষেধ আজও আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়।
দুই বছর আগে আমার পৃথিবী, আমার জান্নাত—আমার মা না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু মায়ের মৃত্যু হলেও মায়ের ভালোবাসা কখনো মরে না। প্রতিটি মুহূর্তে আমি তাঁকে অনুভব করি। মনে হয় তিনি এখনো আমার চোখের সামনে আছেন, আমার জন্য দোয়া করছেন।
মা, মা গো—
তুমি ওপারে ভালো থেকো।
আল্লাহ তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
বিশ্বজুড়ে মায়ের মহিমা
মানবতার সেবায় আত্মনিবেদিত মাদার তেরেসা-র নাম আজও বিশ্ববাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। তিনি নিজের জীবনকে অসহায় মানুষের সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। “মাদার” শব্দটির অর্থই মা। তাঁর সেবাময় জীবন প্রমাণ করে—মা শুধু জন্মদাত্রী নন, মা মানে মমতা, মানবতা ও আশ্রয়।
বর্তমান সমাজে মায়ের প্রতি দায়িত্ব
বর্তমান সময়ে অনেক মা-বাবা অবহেলার শিকার হচ্ছেন। বৃদ্ধ বয়সে অনেকেই একাকিত্বে দিন কাটান। অথচ আমাদের মনে রাখতে হবে—যে মা আমাদের জন্য সারাজীবন কষ্ট করেছেন, তাঁর প্রতি দায়িত্ব পালন করা আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্য।
আজকের এই মা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—কোনো মা যেন অবহেলিত না হন, কোনো মা যেন বৃদ্ধাশ্রমে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে বাধ্য না হন। মায়ের হাতে একমুঠো খাবার তুলে দেওয়া, তাঁর পাশে কিছু সময় বসা, তাঁর মুখে হাসি ফোটানো—এসবই সন্তানের সবচেয়ে বড় ইবাদত ও মানবিক দায়িত্ব। কারণ পৃথিবীতে মায়ের চেয়ে বড় বন্ধু, বড় আশ্রয় এবং বড় দোয়া আর কেউ হতে পারে না। মা বেঁচে থাকলে ঘর আলোকিত থাকে, আর মা হারিয়ে গেলে জীবনের এক বিশাল আকাশ শূন্য হয়ে যায়।
মায়ের মুখে হাসি ফোটানোই সন্তানের সবচেয়ে বড় সফলতা। জীবিত অবস্থায় মায়ের সেবা করা এবং মৃত্যুর পর তাঁর জন্য দোয়া করা প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব।
মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ
ধন-সম্পদ, খ্যাতি কিংবা ক্ষমতা—সবকিছু হারিয়েও মানুষ আবার ফিরে পেতে পারে। কিন্তু মা হারানোর শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না। মা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেয়ামত, সবচেয়ে বড় আশ্রয় এবং সবচেয়ে বড় দোয়া।
আন্তর্জাতিক মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। যারা আজও মায়ের সান্নিধ্যে আছেন, তারা যেন মায়ের মূল্য বুঝতে পারেন। আর যাদের মা পৃথিবীতে নেই, তারা যেন মায়ের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে তাঁর জন্য দোয়া করেন।
মা আমার পৃথিবী।
মা আমার জান্নাত।
মা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আলো।
লেখক
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা

সাংবাদিক, সংগঠক ও সমাজসেবক

About bnews24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Scroll To Top