নড়াইল থেকে ঘুরে এসে প্রতিবেদন তৈরি করেন মো.মঞ্জুর হোসেন ঈসা
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংগীত, লোকসংস্কৃতি ও শিল্পচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ, গবেষণা এবং বিশ্বদরবারে তুলে ধরার লক্ষ্যে “নড়াইল সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়” প্রতিষ্ঠার দাবি এখন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সুসংহতভাবে পৌঁছে দেওয়ার একটি সময়োপযোগী জাতীয় উদ্যোগ।
বর্তমান বিশ্বে যে জাতি তার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে শক্তভাবে ধারণ করতে পারে, সেই জাতিই বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। সেই বাস্তবতায় নড়াইলে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এখন অত্যন্ত যৌক্তিক, প্রয়োজনীয় এবং সময়ের অনিবার্য দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নড়াইল : দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু
নড়াইল বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন অবহেলিত এই জেলা এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নয়নের ফলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
পদ্মা সেতু এবং মধুমতী সেতু চালু হওয়ার পর নড়াইলের ভৌগোলিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে নড়াইল জেলা খুলনা, যশোর, মাগুরা, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের একটি আঞ্চলিক হাবে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—যা নড়াইলের রয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়বিহীন জেলা
নড়াইল জেলায় এখনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের খুলনা, যশোর কিংবা ঢাকামুখী হতে হয়। অথচ নড়াইলের মতো ঐতিহ্যবাহী জেলায় একটি বিশেষায়িত সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তা শুধু নড়াইল নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার উর্বর ভূমি
নড়াইল দীর্ঘদিন ধরেই সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এ অঞ্চলের গ্রামীণ জীবন, পালাগান, জারি-সারি, বাউল, লালনচর্চা, নাট্যধারা এবং লোকজ ঐতিহ্য বাংলাদেশের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নড়াইল বহু কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীর জন্মস্থান। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিচর্চা বাংলার শেকড়কে ধারণ করে আছে। ফলে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নড়াইল একটি আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নজরুল চেতনা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্র
কাজী নজরুল ইসলাম এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতা, সাম্যবাদ ও বিদ্রোহী দর্শন নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
নড়াইলে দীর্ঘদিন ধরে নজরুলচর্চা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে “নজরুল চেতনার বাতিঘর ঘরামীঘর” এবং “অগ্নিবীণা সংসদ” সাংস্কৃতিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
নড়াইল সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের “নজরুল চেতনার বাতিঘর ঘরামীঘর”-এ প্রথমবারের মতো সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এইচ এম সিরাজ এবং উপস্থাপনা করেন মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা।
এই উদ্যোগ পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এ দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে শুরু করে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাংস্কৃতিক উচ্চশিক্ষার শূন্যতা
খুলনা বিভাগে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও সংস্কৃতি, নাট্যকলা, চলচ্চিত্র, চারুকলা ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই।
ফলে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের রাজধানীকেন্দ্রিক হতে হয়। এতে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আর্থিক ও সামাজিক কারণে উচ্চশিক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ে।
নড়াইলে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে শিক্ষার্থীরা নিজ অঞ্চলে থেকেই নিম্নোক্ত বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে—
বাংলা সাহিত্য
নজরুল স্টাডিজ
লোকসংস্কৃতি ও ফোকলোর
সংগীত
নাট্যকলা
চারুকলা
চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যম
নৃত্যকলা
সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনা
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও গবেষণা
লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে গবেষণাকেন্দ্র
বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। গ্রামীণ নাট্যরীতি, পুঁথি সাহিত্য, লোকবাদ্য, পালাগান, বাউলগান, জারি-সারি ও লোককথা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও আর্কাইভ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
নড়াইলের ভৌগোলিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এ ধরনের গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
পর্যটন ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে—
দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের আগমন বাড়বে
সাংস্কৃতিক পর্যটনের বিকাশ ঘটবে
স্থানীয় শিল্পী, কারুশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে
হোটেল, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটবে
নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে
ফলে নড়াইল অর্থনৈতিকভাবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নগরীতে রূপ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি তুলে ধরার সুযোগ
বর্তমান বিশ্বে সাংস্কৃতিক কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলা সাহিত্য এবং রবীন্দ্র-নজরুল দর্শন আন্তর্জাতিকভাবে গবেষণা ও প্রচারের জন্য একটি বিশেষায়িত সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের “সফট পাওয়ার” বৃদ্ধি করবে এবং বিশ্বপরিসরে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরবে।
তরুণ প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যম
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যুগে তরুণদের মধ্যে সাংস্কৃতিক চর্চা দিন দিন কমে যাচ্ছে। একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এটি শুধু শিক্ষার কেন্দ্র হবে না; বরং জাতীয় চেতনা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
সময়ের দাবি
নড়াইলে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে না; বরং বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও ফ্রান্সে বিশেষায়িত সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগীত, নাটক, চারুকলা, চলচ্চিত্র ও লোকঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হচ্ছে। ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য, শিল্প ও মানবিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়েছে; ইন্দিরা কলা সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত, নৃত্য ও লোকসংস্কৃতি শিক্ষার কেন্দ্র; চীনের বেইজিং ফিল্ম একাডেমি চলচ্চিত্র শিক্ষা ও নির্মাণে বিশ্বখ্যাত; জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টস শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করছে; আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব আর্টস বিশ্বব্যাপী “কে-কালচার” বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হলো জাতীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ, সৃজনশীল শিক্ষা সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক কূটনীতি শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশের নড়াইলে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিমুখী করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
এ বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের শেকড়ের সঙ্গে পরিচিত করবে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করবে এবং বিশ্বদরবারে বাঙালি জাতিকে আরও মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপন করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
তাই জাতীয় স্বার্থে, সাংস্কৃতিক বিকাশের স্বার্থে এবং দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে নড়াইলে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এখন সময়ের সবচেয়ে যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
Welcome To B News Just another WordPress site
