রবিবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ‘হলিডে ইন’ হোটেল এ নির্দেশিকা প্রকাশ অনুষ্ঠান করা হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমানের সভাপত্বিতে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী, বিএপির সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন।
এতে বলা হয়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে মারা যাচ্ছে। নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, মেডিক্যাল মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশুনা করার শিক্ষার্থী কম। সবাই মেডিসিন, গাইনি, সার্জারি এসব বিষয় নিয়ে পড়ার আগ্রাহ দেখান।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরই শীর্ষে আছে আত্মহত্যার ঘটনা। আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি তরুণ বয়সের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে। বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। আমি মনে করি এ নির্দেশিকা আমাদের মৃত্যু হার কমাতে সহায়ক হবে।
আত্মহত্যার প্রবণতা যাদের মধ্যে বেশি
মানসিক রোগ-বিষণ্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, অ্যাডজাস্টমে ডিসঅর্ডার, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, ইত্যাদি। রোগগুলোর মধ্যে বিষণ্নতা আক্রান্তদের আত্মহত্যা ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এছাড়া মাদকাসক্তি, অতীতে আত্মহত্যার চেষ্টা বা নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা, একাকীত্ব, বিবাহবিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, প্রিয়জনের মৃত্যু, শিক্ষা বা পেশাগত ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, আর্থিক সংকট, ঋণগ্রস্ততা, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হওয়া, বেকারত্ব, যে কোনো বীভত্সতা, দুর্যোগ, বিপর্যয়, ক্ষতি তা প্রাকৃতিকই হোক বা মানবসৃষ্ট, পারিবারিক কলহ, পরিবারের কারো মানসিক রোগ, আত্মহত্যা বা মাদকাসক্তির ইতিহাস, দীর্ঘমেয়াদী বা ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য শারীরিক রোগ, যাদের জীবনে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের উপস্থিতি বেশী তাদের আত্মহত্যার আশঙ্কা বেশি। আত্মহত্যা প্রতিরোধে চলচ্চিত্র-নির্মাতা, মঞ্চ ও পর্দার কলাকুশলীদের জন্য সহায়ক নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা। চলচ্চিত্র-নির্মাতা, মঞ্চ ও পর্দার কলাকুশলীরা যদি যার যার অবস্থান থেকে যদি সচেষ্ট ভূমিকা পালন করি তাহলে আমরা আত্মহত্যার হার অনেক কমিয়ে আনতে পারব। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতার শূন্যতে নামিয়ে না আনতে পারলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। যাতে অকাল মৃত্যু না হয়।
তিনি বলেন, আমাদের নাটক, চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের উচিত এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে আত্মহত্যাকে কেউ সমাধান মনে না করেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজ। তারা যেন আত্মহত্যাকে নেতিবাচক অর্থে নেয়।
মানসিক চিকিৎসা সহায়তা কোথায় পাবেন?
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল, ঢাকার তেজগাঁও কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ ও কাউন্সেলিং অ্যান্ড এডুকেশনাল সাইকোলজি বিভাগ।
চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং কলাকুশলীরা ভূমিকা যা হওয়ার প্রয়োজন
নির্দেশিকায় বলা হয়— এমন চরিত্র ও ঘটনা যুক্ত করা, যা ভেঙে পড়া নয়, বরং সমস্যা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা দেবে। কীভাবে সহায়ক সেবার সুফল পাওয়া যাবে তা তুলে ধরা। বন্ধু, পরিবার ও অন্যান্যদের সহায়তার যে একটি ইতিবাচক শক্তি আছে, তা জানানো। আত্মহত্যার পদ্ধতি বা দৃশ্য দেখানো বা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকা। আত্মহত্যার অবাস্তব চিত্র উপস্থাপন না করা। আত্মহত্যাপ্রবণতার লক্ষণগুলো তুলে ধরা। আত্মহত্যা সম্পর্কিত বিষয়গুলোর জটিলতা এবং ব্যাপকতা বিশদভাবে তুলে ধরা। যথাযথ ভাষা প্রয়োগ করা। আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী বা বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া। কনটেন্ট শুরুর আগে কনটেন্টের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। আত্মহত্যাবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাণ করতে গিয়ে এর পাত্র-পাত্রী, কলাকুশলীদের মনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কি না, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা। আঠারো (১৮) বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নির্মিত কনটেন্টের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রাখা।
সংবাদ পরিবেশনে যা করা যাবে, যা যাবে না
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আত্মহত্যার ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা কোথায় ও কিভাবে সাহায্য পেতে পারেন সে বিষয়ে সঠিক তথ্য প্রদান। আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিয়ে জনগণকে সচেতন করা। কিভাবে মানসিক চাপ বা আত্মঘাতী চিন্তা মোকাবেলা করা যায় এবং কিভাবে সাহায্য পাওয়া যায় সে সম্পর্কে সহায়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করা। সেলিব্রেটি/বিখ্যাত ব্যক্তিদের আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে সতর্কতা অবলম্বন করা। শোকগ্রস্ত পরিবার বা বন্ধুদের সাক্ষাতকার গ্রহণের সময় সাবধানতা অবলম্বন করা; যেন আপনার কোনো প্রশ্নে তার মনে আঘাত না পায়। আত্মত্মহত্যার সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনকারী সংবাদকর্মী নিজেও আত্মহত্যার ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে তারা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন।
আত্মহত্যার সংবাদটি খুব গুরত্বপূর্ণ স্থানে প্রকাশ করবেন না এবং অযথা সংবাদটি পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। এমন কোনো ভাষা ব্যবহার করা যাবে না যাতে আত্মহত্যা একটি স্বাভাবিক ঘটনা, অথবা আত্মহত্যা কোন সমস্যার সমাধান মনে হতে পারে। বিস্তারিতভাবে আত্মহত্যার পদ্ধতির বিবরণ প্রদান করা যাবে না। আত্মহত্যার স্থান নিয়ে বিশদ বিবরণ না করা। শিরোনাম ব্যবহারে সর্তক থাকতে হবে। ছবি, ভিডিও ফুটেজ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোনো লিংক প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
Welcome To B News Just another WordPress site
